খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৯ই জানুয়ারি ২০১৫, ১১:৪২ এএম
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম বিভাগের একটি অনন্য এবং ঐতিহ্যবাহী প্রশাসনিক অঞ্চল চাঁদপুর। পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া—এই তিন প্রমত্তা নদীর মিলনস্থলে অবস্থিত এই জেলাটি তার ভৌগোলিক অবস্থান এবং অর্থনৈতিক গুরুত্বের কারণে সারা দেশে সুপরিচিত। বিশেষ করে জাতীয় মাছ ইলিশের অন্যতম প্রধান প্রজনন ক্ষেত্র ও বাণিজ্য কেন্দ্র হওয়ায় এই জেলাকে ভালোবেসে “ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর” নামে ডাকা হয়। এছাড়া প্রাচীনকাল থেকেই নদী বন্দর হিসেবে খ্যাতি থাকায় এককালে চাঁদপুরকে “গেটওয়ে অব ইস্টার্ন ইন্ডিয়া” বা পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার বলা হতো। উপজেলার সংখ্যার বিচারে এটি বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী “এ” শ্রেণিভুক্ত জেলা।

প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে গতিশীল করতে চাঁদপুর জেলাকে মোট ৮টি উপজেলায় বিভক্ত করা হয়েছে। এই উপজেলাগুলো তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য ও অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ। উপজেলাগুলো হলো:
১. চাঁদপুর সদর: জেলার মূল কেন্দ্রবিন্দু এবং অন্যতম প্রধান নদী বন্দর ও বাণিজ্যিক এলাকা।
২. হাজীগঞ্জ: ব্যবসা-বাণিজ্য এবং প্রাচীন ঐতিহাসিক নিদর্শনের জন্য বিখ্যাত।
৩. মতলব উত্তর: কৃষি ও মৎস্য চাষের জন্য সুপরিচিত, যার একটি বড় অংশ মেঘনা নদীবেষ্টিত।
৪. মতলব দক্ষিণ: শিক্ষা ও সংস্কৃতির অন্যতম চারণভূমি।
৫. ফরিদগঞ্জ: ডাকাতিয়া নদীর তীরবর্তী এই অঞ্চলটি ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের জন্য পরিচিত।
৬. কচুয়া: জেলার অন্যতম বৃহৎ উপজেলা, যা কৃষি উৎপাদনে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
৭. শাহরাস্তি: হযরত শাহরাস্তি (র.)-এর মাজার শরিফকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলের ধর্মীয় গুরুত্ব অপরিসীম।
৮. হাইমচর: মেঘনার কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই উপজেলাটি ইলিশের অভয়াশ্রম এবং চরাঞ্চলের বৈচিত্র্যময় জীবনের জন্য পরিচিত।
চাঁদপুরের প্রশাসনিক ইতিহাসের শিকড় বেশ গভীর। ব্রিটিশ আমলে ১৮৭৮ সালে তৎকালীন ত্রিপুরা জেলা (পরবর্তীতে যা কুমিল্লা জেলা নামে পরিচিতি পায়) যে তিনটি মহকুমা নিয়ে গঠিত হয়েছিল, চাঁদপুর ছিল তার মধ্যে অন্যতম। দীর্ঘ সময় মহকুমা হিসেবে থাকার পর, ১৯৮৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি চাঁদপুর পূর্ণাঙ্গ জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
চাঁদপুর অঞ্চলের নামকরণের ইতিহাস নিয়ে ঐতিহাসিক ও গবেষকদের মধ্যে চমৎকার কিছু মতভেদ এবং লোকশ্রুতি রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান তিনটি মতবাদ নিচে দেওয়া হলো:
জমিদার চাঁদরায়ের তত্ত্ব:
বাংলার বারো ভূঁইয়াদের আমলে বর্তমান চাঁদপুর অঞ্চলটি বিক্রমপুরের বিখ্যাত জমিদার চাঁদরায়ের শাসনাধীন ছিল। এই অঞ্চলে তিনি একটি প্রশাসনিক বা শাসনকেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন। ঐতিহাসিক জে এম সেনগুপ্তের মতে, এই প্রভাবশালী জমিদার চাঁদরায়ের নাম থেকেই কালক্রমে এই জনপদের নাম হয়েছে চাঁদপুর।
চাঁদ ফকিরের লোকশ্রুতি:
অন্য একটি প্রচলিত মতানুসারে, বর্তমান চাঁদপুর শহরের কোড়ালিয়া এলাকার পুরিন্দপুর মহল্লায় ‘চাঁদ ফকির’ নামে একজন অত্যন্ত জনপ্রিয় ও আধ্যাত্মিক সাধক বসবাস করতেন। স্থানীয় মানুষের কাছে তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ছিলেন এবং তাঁর নামানুসারেই এই এলাকার নাম চাঁদপুর রাখা হয়।
প্রশাসক শাহ আহমেদ চাঁদের ইতিহাস:
তৃতীয় আরেকটি ঐতিহাসিক মতে, পঞ্চদশ শতকে দিল্লি থেকে ‘শাহ আহমেদ চাঁদ’ নামে একজন দূরদর্শী প্রশাসক এই অঞ্চলে আসেন। তিনি এই নদীবেষ্টিত অঞ্চলের গুরুত্ব বুঝতে পেরে এখানে একটি নদী বন্দর স্থাপন করেছিলেন। এই মুসলিম শাসকের নামানুসারেই পরবর্তীকালে এই নদী বন্দরের চারপাশের অঞ্চলের নাম হয় চাঁদপুর।

নদী, ইলিশ আর ইতিহাসের এই মেলবন্ধনে গড়া চাঁদপুর জেলা আজ কেবল ৮টি উপজেলার সমষ্টি নয়, বরং বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং লোকসংস্কৃতির এক অন্যতম প্রধান স্তম্ভ।
মন্তব্য